হিমালয়ের কোলে এক অসাধারণ, আর কিছুটা ভয়জাগানো জায়গার নাম Skeleton Lake।

0
482

আপনি যদি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রূপকুন্ড হ্রদের নাম শুনে থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন, এটাই Skeleton Lake হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৬ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদ বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে। তবে গ্রীষ্মের কয়েকটি সপ্তাহে যখন বরফ গলে, তখন হ্রদের তলদেশে ভেসে ওঠে শত শত মানুষের কঙ্কাল। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন, একটা হ্রদের পানিতে দেখা যায় মানুষের খুলি, হাঁড়, হাড়ের অংশবিশেষ। স্বাভাবিকভাবেই এই দৃশ্য অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এত মানুষ একসাথে কীভাবে মা-রা গেল? তারা কারা ছিল? আর তাদের মৃ-ত্যু কি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গল্প?

 

এই রহস্য প্রথম নজরে আসে ১৯৪২ সালে। তখন ব্রিটিশ সেনারা দুর্গম পাহাড়ি পথে টহল দিতে গিয়ে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করে হ্রদের তীরে পড়ে থাকা অসংখ্য কঙ্কাল। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, হয়তো তারা জাপানি সেনা, যাঁরা দ্বিতীয় বিশ্ব-যু-দ্ধে-র সময় গোপনে ভারত সীমান্তে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু দ্রুতই দেখা যায়, এটি দ্বিতীয় বিশ্ব-যু-দ্ধে-র কোনো কাহিনি নয়। এই কঙ্কালগুলো আরও অনেক পুরোনো।

 

তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা এই হ্রদের কঙ্কাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ২০০৪ সালে একদল ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক প্রথমবারের মতো ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন এই কঙ্কালগুলোর উপর। গবেষণায় দেখা যায়, কঙ্কালগুলো এক সময়ে মৃ-ত হয়নি। বরং এদের মৃ-ত্যু হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন শতকে। এদের মধ্যে কিছু মানুষ ছিলেন দক্ষিণ এশীয়, আবার কিছু মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে মিল রেখে, বিশেষ করে গ্রিস বা ক্রিট দ্বীপের বাসিন্দাদের মতো।

 

২০১৯ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় আরও চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে। সেখানে ৩৮টি কঙ্কালের জিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেন, তারা অন্তত তিনটি আলাদা গোষ্ঠীর অংশ। একদল ছিল স্থানীয়, আরেকদল ছিল ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে আগত, কিন্তু তৃতীয় দলটি এসেছিল ইউরোপ থেকে। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের মানুষ কীভাবে এত উঁচু হিমালয় পেরিয়ে সেখানে এলেন? এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা মেলেনি। কেউ কেউ মনে করেন, এটি ছিল কোনো ধর্মীয় যাত্রা বা তীর্থযাত্রা, যেখানে পথ হারিয়ে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এদের মৃ-ত্যু হয়।

 

আরেকটি তত্ত্ব বেশ আলোচিত হয়েছে। হ্রদের চারপাশে পাওয়া কঙ্কালগুলোর মাথার খুলি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগেরই মাথায় গভীর ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, এই চিহ্নগুলো কোনো অ-স্ত্রে-র আঘাত নয়। বরং সম্ভবত তারা মা-রা গিয়েছিলেন বিশাল আকারের শিলাবৃষ্টিতে। এমন এক ধরনের শিলাবৃষ্টি, যার প্রতিটি শিলার আকার ছিল ক্রিকেট বলের মতো। হঠাৎ করে শুরু হওয়া এই ভয়ানক দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, আর সেই কারণেই এতগুলো মানুষের একসাথে মৃ-ত্যু ঘটে।

 

আপনি বুঝতেই পারছেন, Skeleton Lake শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান নয়, এটি একসাথে ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং মানবিক ট্র্যাজেডির এক অসাধারণ মিলনস্থল। আজও বিজ্ঞানীরা সেখানে যান, কঙ্কালগুলো নিয়ে গবেষণা চালান, কারণ প্রতিটি কঙ্কালের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাচীন কোনো মানুষের জীবনের গল্প। আপনিও যদি কোনোদিন রূপকুন্ড হ্রদে যান, বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই শত শত কঙ্কালের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর অনুভূতি পাবেন, আমরা যতই সভ্য হই না কেন, প্রকৃতির সামনে মানুষ আজও কতটা ছোট আর দুর্বল।

Buscar
Categorías
Read More
Other
মায়ের একটি সাধারণ চুমু কেবল আদরের প্রকাশ নয়, এটি মা ও শিশুর মধ্যে এক গভীর বৈজ্ঞানিক এবং বিস্ময়কর সংযোগ তৈরি করে।
মায়ের মস্তিষ্কে যা ঘটে: যখন একজন মা তার সন্তানকে চুমু খান, তখন তার মস্তিষ্কের প্লেজার সার্কিট...
By Sharif Uddin 2025-07-30 20:09:20 0 323
Sports
জো রুট আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি
ব্যাট হাতে তিনি যেন সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এক শিল্পী, যিনি প্রতিপক্ষ ও কন্ডিশনের পরোয়া না...
By Phoenix (Striker) 2025-07-11 17:47:04 0 718
Tech
ফিঙ্গারপ্রিন্ট পদ্ধতির আসল জনক কে? জানলে চমকে যাবেন!"
"১৮৯২ সাল, ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ধূসর করিডোর তখন রহস্যে মোড়া। সেখানে একজন...
By Sharif Uddin 2025-08-05 18:46:22 0 446
Tech
How a gps tag work?
🔑 How It Works: The tag has a built-in GPS chip to find its own real-time location. It uses...
By Steve Harrington 2025-07-06 16:08:48 0 1K
Tech
এমআইটি (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি) এর বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন যা সৌর শক্তির সাহায্যে মরুভূমির মতো শুষ্ক স্থানের বাতাস থেকে পানীয় জল বের করতে পারে।
  ### 🔍 এই সিস্টেম কিভাবে কাজ করে? 1. **MOF (মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস)** নামে একটি...
By Yeara Meherish 2025-07-27 12:56:30 0 385
BlackBird Ai
https://bbai.shop